ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা (Importance or Necessity of Small and Medium Enterprises – SME)
একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত।
এসব শিল্প বৃহৎ শিল্পের তুলনায় কম মূলধনে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং দ্রুত শিল্পায়নের পথ সুগম করে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পই হচ্ছে অর্থনীতির মেরুদণ্ড (Backbone of the Economy)।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের গুরুত্ব / প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিত আলোচনা:
নিচে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ১২টি প্রধান গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো
১। কর্মসংস্থান সৃষ্টি (Employment Generation)
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প শ্রমঘন প্রকৃতির। অল্প মূলধনে তুলনামূলকভাবে বেশি শ্রমিক নিয়োগ করা যায়।
গ্রামীণ ও শহরতলির বিপুল বেকার জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদান করে এই খাত।
উদাহরণ: হস্তশিল্প, সেলাই, কাঠের কাজ, মুদ্রণ, ছোট গার্মেন্টস ইত্যাদি।
২। দারিদ্র্য বিমোচন (Poverty Alleviation)
এসএমই খাতের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে।
এতে তাদের আয় বৃদ্ধি পায় এবং জীবনমান উন্নত হয়। ফলে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পায়।
৩। গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ (Rural Development)
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সাধারণত গ্রামীণ এলাকাভিত্তিক হয়।
এগুলো গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি করে, নগরমুখী জনস্রোত কমায় এবং গ্রামীণ শিল্পায়নের পথ প্রশস্ত করে।
৪। উদ্যোক্তা সৃষ্টি (Entrepreneurship Development)
এসএমই খাত নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করে উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও পুঁজি সঞ্চয় করে বড় উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।
৫। স্থানীয় কাঁচামালের ব্যবহার (Utilization of Local Resources)
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প স্থানীয়ভাবে পাওয়া কাঁচামাল ব্যবহার করে, ফলে বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমে এবং স্থানীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হয়।
৬। অর্থনৈতিক সুষমতা ও আয়ের বণ্টন (Balanced Economic Growth & Income Distribution)
এসএমই খাত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করে।
এতে আয়ের বৈষম্য হ্রাস পায় এবং অর্থনৈতিক সুষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
৭। রপ্তানি বৃদ্ধি (Export Promotion)
অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মানের পণ্য উৎপাদন করে রপ্তানি আয়ে অবদান রাখে।
যেমন: তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, চামড়াজাত পণ্য, সিরামিক ইত্যাদি।
৮। বৃহৎ শিল্পের সহায়ক ভূমিকা (Supporting Large Industries)
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বৃহৎ শিল্পের জন্য সহায়ক উপকরণ, খুচরা যন্ত্রাংশ ও সেবা সরবরাহ করে।
ফলে বৃহৎ শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কার্যকর হয়।
৯। মূলধনের কার্যকর ব্যবহার (Efficient Use of Capital)
এসএমই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ কম হলেও উৎপাদনের হার তুলনামূলকভাবে বেশি।
অতএব, প্রতি টাকার বিনিময়ে বেশি উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সম্ভব হয়।
১০। নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ (Women Empowerment)
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারীরা সহজে যুক্ত হতে পারেন।
বিশেষ করে সেলাই, হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রভৃতি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করে।
১১। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও উদ্ভাবন (Technological & Product Innovation)
এসএমই উদ্যোক্তারা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নতুন পণ্য ও প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করে থাকে।
এতে প্রযুক্তিগত জ্ঞান বৃদ্ধি পায় ও দেশের শিল্প কাঠামো আধুনিক হয়।
১২। জাতীয় আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি (Increase in National Income & GDP Growth)
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প দেশের উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় আয় ও জিডিপিতে সরাসরি অবদান রাখে।
বাংলাদেশে এসএমই খাত বর্তমানে জিডিপির প্রায় ২৫%–৩০% পর্যন্ত অবদান রাখছে।
সংক্ষেপে (Summary Table):
| ক্র. | গুরুত্ব / প্রয়োজনীয়তা | ফলাফল |
|---|---|---|
| ১ | কর্মসংস্থান সৃষ্টি | বেকারত্ব হ্রাস |
| ২ | দারিদ্র্য বিমোচন | জীবনমান উন্নয়ন |
| ৩ | গ্রামীণ উন্নয়ন | নগরমুখী চাপ কমানো |
| ৪ | উদ্যোক্তা সৃষ্টি | আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি |
| ৫ | স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার | আমদানি নির্ভরতা হ্রাস |
| ৬ | আয়ের সুষম বণ্টন | অর্থনৈতিক ভারসাম্য |
| ৭ | রপ্তানি বৃদ্ধি | বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন |
| ৮ | বৃহৎ শিল্পের সহায়ক | শিল্পখাতের সমন্বয় |
| ৯ | মূলধনের সঠিক ব্যবহার | বিনিয়োগের কার্যকারিতা বৃদ্ধি |
| ১০ | নারীর অংশগ্রহণ | নারীর ক্ষমতায়ন |
| ১১ | প্রযুক্তি উদ্ভাবন | আধুনিক শিল্পায়ন |
| ১২ | জাতীয় আয় বৃদ্ধি | টেকসই প্রবৃদ্ধি |
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়— এটি একটি দেশের শিল্প, কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসএমই খাত দারিদ্র্য বিমোচন, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তাই এই খাতের সম্প্রসারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
Post a Comment