বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ধরন বা প্রকারভেদ (Types or Classification of Small and Medium Enterprises in Bangladesh)

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ধরন বা প্রকারভেদ

(Types or Classification of Small and Medium Enterprises in Bangladesh)




একটি দেশের শিল্প কাঠামো সাধারণত দুইভাবে গঠিত— বৃহৎ শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME)

বাংলাদেশের শিল্পায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই খাত অর্থনীতির প্রাণশক্তি হিসেবে কাজ করছে, কারণ এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় বণ্টন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে মূলত বিনিয়োগের পরিমাণ, কর্মচারীর সংখ্যা, ও শিল্পের প্রকৃতি অনুসারে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।


বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রকারভেদ

বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প করপোরেশন (BSCIC) অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে নিম্নরূপে ভাগ করা যায় 👇


🏭 ১️।  উৎপাদন বা শিল্পভিত্তিক প্রকারভেদ (Based on Nature of Industry)

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রকৃতি অনুযায়ী এগুলোকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয় —

(ক) উৎপাদনমুখী শিল্প (Manufacturing Enterprises)

এই শিল্পে কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে নতুন পণ্য উৎপাদন করা হয়।
 যেমন — মিষ্টি, বিস্কুট, পোশাক, আসবাব, প্লাস্টিক সামগ্রী, মাটির পণ্য, ইটভাটা, হালকা যন্ত্রাংশ ইত্যাদি।

(খ) সেবামূলক শিল্প (Service Enterprises)

এই ধরনের শিল্প সরাসরি পণ্য উৎপাদন করে না, বরং বিভিন্ন ধরণের সেবা প্রদান করে।
যেমন — প্রিন্টিং প্রেস, রেস্টুরেন্ট, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা ইত্যাদি।

(গ) বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান (Trading Enterprises)

এরা মূলত ক্রয়-বিক্রয় ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
 যেমন — ক্ষুদ্র পাইকারি দোকান, হস্তশিল্প বিপণি, ইলেকট্রনিক্স দোকান, গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রয় কেন্দ্র ইত্যাদি।


💰 ২️। মূলধন বা বিনিয়োগভিত্তিক প্রকারভেদ (Based on Investment Size)

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং শিল্পনীতি অনুযায়ী (শিল্পনীতি ২০২২), ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে মূলধনের পরিমাণ অনুযায়ী নিম্নরূপে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে —

শ্রেণি শিল্পের ধরন স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগের পরিমাণ কর্মচারীর সংখ্যা
ক্ষুদ্র শিল্প (Small Industry) উৎপাদন ও সেবা উভয় খাত উৎপাদন খাতে: সর্বোচ্চ ৭৫ লক্ষ টাকা পর্যন্তসেবা খাতে: সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সাধারণত ১৫–৫০ জন
মাঝারি শিল্প (Medium Industry) উৎপাদন ও সেবা উভয় খাত উৎপাদন খাতে: ৭৫ লক্ষ টাকার বেশি এবং সর্বোচ্চ ১৫ কোটি টাকা পর্যন্তসেবা খাতে: ৫০ লক্ষ টাকার বেশি এবং সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সাধারণত ৫০–১৫০ জন

📘 নোট:

  • এই সীমাগুলো সময়ের সঙ্গে সরকার শিল্পনীতি অনুযায়ী হালনাগাদ করে।
  • “ক্ষুদ্র” শিল্প সাধারণত স্থানীয় বাজারমুখী, আর “মাঝারি” শিল্প আঞ্চলিক বা জাতীয় বাজারে উৎপাদন পরিচালনা করে।


🧑‍🏭 ৩️। শ্রমের পরিমাণভিত্তিক প্রকারভেদ (Based on Number of Workers)

শিল্পে কতজন শ্রমিক বা কর্মচারী নিয়োজিত আছে তার ওপর ভিত্তি করেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে নিম্নরূপে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়—

শিল্পের ধরন শ্রমিক সংখ্যা
অতিক্ষুদ্র শিল্প (Micro Enterprise) ১০ জনের কম
ক্ষুদ্র শিল্প (Small Enterprise) ১০–৫০ জন
মাঝারি শিল্প (Medium Enterprise) ৫০–১৫০ জন

 অর্থাৎ, যত বেশি শ্রমিক, তত বড় শিল্পের পরিসর।


🧵 ৪️। পণ্যের প্রকৃতিভিত্তিক প্রকারভেদ (Based on Type of Product)

উৎপাদিত পণ্যের ধরন অনুযায়ী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে নিম্নরূপে ভাগ করা যায় —

(ক) ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী শিল্প (Consumer Goods Industries)

যেসব শিল্প সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে পণ্য উৎপাদন করে।
যেমন — সাবান, পোশাক, খাদ্যদ্রব্য, জুতা, আসবাবপত্র ইত্যাদি।

(খ) অর্ধসমাপ্ত বা মধ্যবর্তী পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প (Intermediate Goods Industries)

যেসব শিল্প অন্য শিল্পের কাঁচামাল বা উপাদান সরবরাহ করে।
 যেমন — প্লাস্টিকের অংশ, সুতা, কাপড়, লোহা পণ্য ইত্যাদি।

(গ) যন্ত্রাংশ ও উপকরণ সরবরাহকারী শিল্প (Component and Equipment Manufacturing)

যেসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বৃহৎ শিল্পের জন্য খুচরা যন্ত্রাংশ বা মেশিন সরবরাহ করে।
 যেমন — মোটর পার্টস, ইলেকট্রিক যন্ত্রাংশ, প্যাকেজিং উপকরণ ইত্যাদি।

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বৈচিত্র্য অনেক।

এগুলো কেবল পণ্য উৎপাদনই নয়, বরং সেবা, বাণিজ্য, রপ্তানি ও উদ্যোক্তা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অতএব, দেশের শিল্পায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সব প্রকারের যথাযথ বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা অপরিহার্য।


Post a Comment

Previous Post Next Post