উৎপাদন মাত্রা কী? উৎপাদন মাত্রার প্রকারভেদ

উৎপাদন মাত্রা (Scale of Production)


উৎপাদন মাত্রা বলতে বোঝায়— কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ে কত পরিমাণ পণ্য বা সেবা উৎপাদন করছে তার পরিসর বা পরিমাণকে। অর্থাৎ, একটি শিল্প বা প্রতিষ্ঠান তার উৎপাদন কার্যক্রম কতটা বিস্তৃত বা সীমিত আকারে পরিচালনা করছে, সেটিই উৎপাদন মাত্রা নামে পরিচিত।

সহজভাবে বলা যায়,
উৎপাদন মাত্রা হলো উৎপাদন ব্যবস্থার আকার বা বিস্তৃতি। কোনো প্রতিষ্ঠান যত বেশি মূলধন, শ্রম, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উৎপাদন করে, তার উৎপাদন মাত্রা তত বৃহৎ হয়।

উৎপাদন মাত্রার প্রকারভেদ

বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ ও পাঠ্যপুস্তক অনুসারে উৎপাদন মাত্রাকে সাধারণত চারটি ভাগে বিভক্ত করা হয়—

১। অতিক্ষুদ্র উৎপাদন মাত্রা (Very Small Scale Production)

২। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদন মাত্রা (Small and Medium Scale Production)

৩। বৃহদায়তন উৎপাদন মাত্রা (Large Scale Production)

৪। কাম্য উৎপাদন মাত্রা (Optimum Scale of Production)

নিচে প্রতিটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো

১। অতিক্ষুদ্র উৎপাদন মাত্রা (Very Small Scale Production)

অর্থ:
যে উৎপাদনে মূলধন, শ্রম ও যন্ত্রপাতির পরিমাণ অতি সামান্য এবং উৎপাদনও খুব সীমিত পরিসরে হয়, তাকে অতিক্ষুদ্র উৎপাদন মাত্রা বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য:

  • সাধারণত ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত হয়।
  • পুঁজির পরিমাণ খুব কম।
  • যন্ত্রপাতি প্রায় থাকে না বা হাতে পরিচালিত হয়।
  • উৎপাদন মূলত স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর জন্য।
  • শ্রমিক সংখ্যা অল্প।

উদাহরণ:
স্থানীয় লৌহশিল্প, কাঠের কাজ, মৃৎশিল্প, কুটির শিল্প, হাতের তাঁতের কাজ ইত্যাদি।

২। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদন মাত্রা (Small and Medium Scale Production)

অর্থ:
যে উৎপাদনে মূলধন, শ্রম ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার সীমিত হলেও তা অতিক্ষুদ্র উৎপাদনের তুলনায় বেশি এবং উৎপাদন বাণিজ্যিকভাবে কিছুটা বৃহত্তর আকারে পরিচালিত হয়, তাকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদন বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য:

  • পুঁজি ও শ্রমের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি।
  • উৎপাদন বাজারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে বিক্রি হয়।
  • যন্ত্রপাতি আংশিকভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • ব্যবস্থাপনা সাধারণত মালিক নিজেই করে থাকেন।
  • শিল্পের বিস্তার সীমিত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ।

উদাহরণ:
ছোট আকারের মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান, বেকারি, আসবাবপত্র কারখানা, গার্মেন্টসের ছোট ইউনিট, ক্ষুদ্র প্রকৌশল কারখানা ইত্যাদি।

৩। বৃহদায়তন উৎপাদন মাত্রা (Large Scale Production)

অর্থ:
যে উৎপাদনে বিপুল পরিমাণ মূলধন, শ্রম, আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার করা হয় এবং যার উৎপাদন সারা দেশ বা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পরিচালিত হয়, তাকে বৃহদায়তন উৎপাদন বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য:

  • মূলধন ও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার।
  • দক্ষ শ্রমিক ও বিশেষজ্ঞ ব্যবস্থাপনা টিম থাকে।
  • যন্ত্রনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন পদ্ধতি।
  • উৎপাদনের পরিমাণ বিপুল, ফলে একক ব্যয় কমে যায় (Economies of Scale)।
  • বাজার বিস্তৃত ও প্রতিযোগিতামূলক।

উদাহরণ:
বড় গার্মেন্টস শিল্প, সিমেন্ট কারখানা, মোটরগাড়ি শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, স্টিল মিল, তেল শোধনাগার ইত্যাদি।

৪। কাম্য উৎপাদন মাত্রা (Optimum Scale of Production)

অর্থ:
যে মাত্রায় উৎপাদন করলে একটি প্রতিষ্ঠান সর্বাধিক দক্ষতা অর্জন করে— অর্থাৎ একক ব্যয় (Unit Cost) সর্বনিম্ন হয় এবং উৎপাদন সর্বাধিক লাভজনক হয়, তাকে কাম্য উৎপাদন মাত্রা বলা হয়।

সহজভাবে:
কাম্য উৎপাদন মাত্রা সেই বিন্দু যেখানে উৎপাদন ব্যয় সবচেয়ে কম এবং লাভ সবচেয়ে বেশি।

বৈশিষ্ট্য:

  • উৎপাদন উপকরণের সর্বোত্তম ব্যবহার ঘটে।
  • অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস পায়।
  • শ্রম ও যন্ত্রপাতির মধ্যে ভারসাম্য থাকে।
  • উৎপাদন পরিমাণ এমন যে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকে।
  • প্রতিষ্ঠান স্থিতিশীলভাবে পরিচালিত হয়।

উদাহরণ:
যদি কোনো কারখানায় ১০,০০০ ইউনিট পণ্য উৎপাদনে প্রতি ইউনিট খরচ সর্বনিম্ন হয়, তবে সেটিই ঐ প্রতিষ্ঠানের কাম্য উৎপাদন মাত্রা।

উৎপাদন মাত্রা নির্ধারণ একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের অন্যতম প্রধান উপাদান। অতিক্ষুদ্র থেকে শুরু করে বৃহদায়তন উৎপাদনের প্রতিটি স্তর অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে কোনো প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে চাইলে তাকে কাম্য উৎপাদন মাত্রা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে— যেখানে সর্বোচ্চ দক্ষতার মাধ্যমে সর্বনিম্ন ব্যয়ে সর্বাধিক উৎপাদন সম্ভব।


Post a Comment

Previous Post Next Post