সংগঠনের শ্রেণীবিভাগ
সমাজে মানুষ নানান উদ্দেশ্যে সংগঠন গড়ে তোলে— কেউ ব্যবসার জন্য, কেউ সেবা বা কল্যাণের জন্য। এসব সংগঠন তাদের মালিকানা, মূলধন ও পরিচালনার ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত। ব্যবসা সংগঠনের ক্ষেত্রে সাধারণত যে শ্রেণীবিভাগ দেখা যায় তা হলো—
এখন নিচে প্রতিটি শ্রেণী বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১. একমালিকানা ব্যবসা (Sole Proprietorship)
সংজ্ঞা:
যে ব্যবসা একক কোনো ব্যক্তি নিজস্ব মূলধনে, নিজের ঝুঁকিতে ও নিজ দায়িত্বে পরিচালনা করে, তাকে একমালিকানা ব্যবসা বলে।
📘 উদাহরণ: মুদি দোকান, দর্জির দোকান, ক্ষুদ্র ওয়ার্কশপ, ফার্মেসি ইত্যাদি।
বৈশিষ্ট্য:
- একক মালিক ও একক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী
- মূলধন আসে ব্যক্তিগত উৎস থেকে
- লাভ-ক্ষতির পুরো দায়িত্ব মালিকের
- সহজে শুরু করা যায়
- ব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল
সুবিধা:
- দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব
- ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও বিশ্বাস বজায় থাকে
- গোপনীয়তা রক্ষা করা সহজ
অসুবিধা:
- মূলধনের সীমাবদ্ধতা
- ঝুঁকি ও ক্ষতি একার উপর পড়ে
- ব্যবসার ধারাবাহিকতা অনিশ্চিত
২. অংশীদারি ব্যবসা (Partnership Business)
সংজ্ঞা:
দুই বা ততোধিক ব্যক্তি যৌথভাবে মূলধন বিনিয়োগ করে, পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি করে যে ব্যবসা পরিচালনা করে, তা অংশীদারি ব্যবসা নামে পরিচিত।
📘 উদাহরণ: আইনজীবী ফার্ম, মেডিকেল চেম্বার, ব্যবসায়িক ফার্ম ইত্যাদি।
বৈশিষ্ট্য:
- অংশীদার সংখ্যা সাধারণত ২ থেকে ২০ জন (ব্যাংকের ক্ষেত্রে ১০ জন পর্যন্ত)
- চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়
- লাভ-ক্ষতি নির্ধারিত অনুপাতে ভাগ হয়
- ব্যবস্থাপনা অংশীদারদের সম্মতিতে চলে
সুবিধা:
- যৌথ মূলধন ও দক্ষতার সমন্বয়
- ঝুঁকি ভাগাভাগি হয়
- সহজে প্রতিষ্ঠা করা যায়
অসুবিধা:
- মতবিরোধের সম্ভাবনা
- অংশীদারের মৃত্যু বা প্রস্থান ব্যবসাকে প্রভাবিত করে
- সীমাহীন দায় (Unlimited liability)
৩. যৌথমূলধনী কোম্পানি (Joint Stock Company)
সংজ্ঞা:
যে ব্যবসায় অনেক শেয়ারহোল্ডার মূলধন বিনিয়োগ করে এবং একটি আইনগত সত্তা হিসেবে সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত হয়, তাকে যৌথমূলধনী কোম্পানি বলে।
📘 উদাহরণ: BEXIMCO, Square, Grameenphone Ltd.
বৈশিষ্ট্য:
- মালিক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আইনগত পার্থক্য থাকে
- শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ
- পরিচালনার জন্য পরিচালনা পর্ষদ থাকে
- মালিকদের দায় সীমিত (Limited Liability)
প্রকারভেদ:
- Private Limited Company
- Public Limited Company
সুবিধা:
- বৃহৎ মূলধন সংগ্রহ সম্ভব
- ব্যবসার ধারাবাহিকতা থাকে
- দায় সীমিত
অসুবিধা:
- প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া জটিল
- হিসাব ও নথি প্রকাশ বাধ্যতামূলক
- মালিকানা ও পরিচালনায় বিভাজন
৪. সমবায় সংগঠন (Co-operative Society)
সংজ্ঞা:
একই পেশা বা উদ্দেশ্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা পরস্পরের সহযোগিতায়, ন্যায্য মূল্যে পণ্য বা সেবা প্রদান ও মুনাফা ভাগাভাগির উদ্দেশ্যে যে সংগঠন গঠন করে, তাকে সমবায় সংগঠন বলে।
📘 উদাহরণ: কৃষি সমবায়, শ্রমিক সমবায়, ভোক্তা সমবায় ইত্যাদি।
বৈশিষ্ট্য:
- সদস্যদের পারস্পরিক সহযোগিতা ভিত্তিক
- লাভের চেয়ে সেবামূলক উদ্দেশ্য মুখ্য
- “এক সদস্য, এক ভোট” নীতি
- সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত
সুবিধা:
- সদস্যদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন
- ন্যায্য মুনাফা বণ্টন
- সামাজিক বন্ধন বৃদ্ধি
অসুবিধা:
- দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব
- সদস্যদের উদাসীনতা
- আর্থিক সীমাবদ্ধতা
৫. ব্যবসায় জোট (Business Combination / Trade Association)
সংজ্ঞা:
একই পেশা বা শিল্পের একাধিক প্রতিষ্ঠান পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমিয়ে মুনাফা বৃদ্ধি ও বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে একত্রিত হলে তাকে ব্যবসায় জোট বলে।
📘 উদাহরণ: ব্যাংক অ্যাসোসিয়েশন, টেক্সটাইল অ্যাসোসিয়েশন, বিজনেস চেম্বার ইত্যাদি।
বৈশিষ্ট্য:
- একই ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জোটবদ্ধ হয়
- মুনাফা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য
- যৌথ সিদ্ধান্তে কাজ করা হয়
সুবিধা:
- বাজারে স্থিতিশীলতা
- উৎপাদন ও বিক্রয় সমন্বয়
- প্রতিযোগিতার ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস
অসুবিধা:
- মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা
- একচেটিয়া ব্যবসার সম্ভাবনা
- ভোক্তার ক্ষতি
৬. যৌথ উদ্যোগ (Joint Venture)
সংজ্ঞা:
দেশীয় ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা দুই বা ততোধিক পক্ষ যখন যৌথভাবে মূলধন, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা সমন্বয় করে কোনো প্রকল্পে কাজ করে, তাকে যৌথ উদ্যোগ বলে।
📘 উদাহরণ: Walton–LG, Japan–Bangladesh Power Project ইত্যাদি।
বৈশিষ্ট্য:
- দুই বা ততোধিক পক্ষের যৌথ অংশগ্রহণ
- চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত
- লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগি
সুবিধা:
- বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর
- উন্নত ব্যবস্থাপনা
- ঝুঁকি ভাগাভাগি
অসুবিধা:
- মতপার্থক্য ও সাংস্কৃতিক সংঘাত
- লাভ বণ্টনে জটিলতা
৭. রাষ্ট্রীয় সংগঠন (Public Enterprise / Government Organization)
সংজ্ঞা:
যে প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন রাষ্ট্রের মালিকানায় থেকে জনগণের কল্যাণ ও জাতীয় উন্নয়ন উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, তাকে রাষ্ট্রীয় সংগঠন বলে।
📘 উদাহরণ: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC), বাংলাদেশ রেলওয়ে, পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ড ইত্যাদি।
বৈশিষ্ট্য:
- রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ
- জনকল্যাণই মুখ্য উদ্দেশ্য
- সরকারি তহবিল দ্বারা পরিচালিত
সুবিধা:
- জাতীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার
- জনসেবা বৃদ্ধি
- কর্মসংস্থান সৃষ্টি
অসুবিধা:
- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
- রাজনৈতিক প্রভাব
- মুনাফার তুলনায় দক্ষতা কম
সংগঠন সমাজ ও অর্থনীতির প্রাণশক্তি। একক প্রচেষ্টায় যা সম্ভব নয়, তা সংগঠনের মাধ্যমে সহজেই সম্পন্ন হয়। সংগঠনের ধরন ভেদে উদ্দেশ্য, পরিচালনা ও মালিকানায় পার্থক্য থাকলেও সবার লক্ষ্যই উন্নয়ন, সেবা ও কল্যাণ।
📖 সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ (পয়েন্ট আকারে):
- একমালিকানা ব্যবসা
- অংশীদারি ব্যবসা
- যৌথমূলধনী কোম্পানি
- সমবায় সংগঠন
- ব্যবসায় জোট
- যৌথ উদ্যোগ
- রাষ্ট্রীয় সংগঠন
Post a Comment