উৎপাদন মাত্রার গুরুত্ব

উৎপাদন মাত্রার গুরুত্ব (Importance of Scale of Production)

উৎপাদন মাত্রা অর্থনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বা শিল্পের উৎপাদনের পরিসর যত বড় হয়, তার কার্যকারিতা ও লাভজনকতা তত বাড়ে। উৎপাদন মাত্রা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারলে প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করে এবং সর্বনিম্ন ব্যয়ে উৎপাদন করতে সক্ষম হয়।

নিচে উৎপাদন মাত্রার গুরুত্ব বা উপকারিতা আলোচনা করা হলো —

১।  উৎপাদন ব্যয় হ্রাস

বৃহৎ মাত্রায় উৎপাদন করলে একক উৎপাদন ব্যয় কমে যায়। কারণ, যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও শ্রমশক্তি অধিক পরিমাণে ব্যবহারের ফলে স্থায়ী ব্যয় (Fixed Cost) বেশি ইউনিটে ভাগ হয়ে যায়।

২। সম্পদের কার্যকর ব্যবহার

উৎপাদন মাত্রা বাড়ালে মূলধন, শ্রম, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব হয়। এতে অপচয় কমে এবং উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

৩। প্রযুক্তির উন্নয়ন ও প্রয়োগ

বৃহৎ উৎপাদন মাত্রায় প্রতিষ্ঠান আধুনিক প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ও উন্নত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে, যা ক্ষুদ্র উৎপাদনে সম্ভব হয় না।

৪। বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ

বৃহদায়তন উৎপাদন মাত্রায় প্রতিষ্ঠান অধিক পরিমাণে পণ্য উৎপাদন করে বৃহৎ বাজারে (দেশীয় ও আন্তর্জাতিক) বিক্রির সুযোগ পায়। এতে বিক্রয় বৃদ্ধি পায় ও লাভও বাড়ে।

৫। প্রতিযোগিতায় সুবিধা

বৃহৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারে, ফলে বাজারে প্রতিযোগিতায় সুবিধা লাভ করে। ক্ষুদ্র উৎপাদকদের তুলনায় তাদের অবস্থান শক্তিশালী হয়।

৬। গুণগত মানের উন্নয়ন

বৃহৎ উৎপাদনে মান নিয়ন্ত্রণের (Quality Control) ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, দক্ষ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ সম্ভব হয়, ফলে পণ্যের মান উন্নত হয়।

৭। দক্ষ শ্রম ও ব্যবস্থাপনার বিকাশ

উৎপাদন মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্র নির্দিষ্ট হয়, ফলে তারা দক্ষতা অর্জন করে। একইভাবে ব্যবস্থাপনাও পেশাদারভাবে পরিচালিত হয়।

৮। অর্থনৈতিক সঞ্চয় ও মুনাফা বৃদ্ধি

বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের ফলে প্রতিষ্ঠান অধিক মুনাফা অর্জন করে। এতে মূলধন সঞ্চয় হয়, যা পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

৯। নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সৃষ্টি

উৎপাদন মাত্রা বৃদ্ধি পেলে কাঁচামাল, পরিবহন, বিপণন ও পরিষেবা খাতে নতুন নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

১০। ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি

বৃহৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ও বিক্রয়ের বৈচিত্র্য আনতে পারে, ফলে কোনো একটি খাতে ক্ষতি হলেও অন্য খাতের মুনাফা দিয়ে তা পুষিয়ে নিতে সক্ষম হয়।

১১। জাতীয় আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি

উৎপাদন মাত্রা বৃদ্ধির ফলে মোট উৎপাদন বাড়ে, ফলে জাতীয় আয় ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায় এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।

১২। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান

বৃহদায়তন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি করতে পারে এবং রপ্তানি বৃদ্ধি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

উৎপাদন মাত্রা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের লাভজনকতা নয়, বরং একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই প্রতিটি শিল্পের উচিত তাদের জন্য উপযুক্ত ও কাম্য উৎপাদন মাত্রা নির্ধারণ করে সর্বোচ্চ দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা অর্জনের চেষ্টা করা।


Post a Comment

Previous Post Next Post