বাংলাদেশে মূলধন গঠনে সমস্যাবলী
(Problems of Capital Formation in Bangladesh)
অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মূলধন গঠন একটি অত্যাবশ্যক উপাদান। একটি দেশের উৎপাদন বৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হলো বিনিয়োগ ও মূলধনের সঞ্চয়। কিন্তু বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মূলধন গঠনের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। পর্যাপ্ত সঞ্চয়ের অভাব, নিম্ন আয়, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের ঘাটতি, প্রযুক্তিগত পশ্চাদপদতা ইত্যাদি কারণে মূলধন গঠনের গতি মন্থর।
নিচে বাংলাদেশে মূলধন গঠনের প্রধান সমস্যাগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো—
১. নিম্ন আয়ের স্তর (Low Level of Income): বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মাসিক আয় খুবই সীমিত। ফলে তাদের আয় থেকে সঞ্চয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অংশ অবশিষ্ট থাকে না। আয় যত কম, সঞ্চয়ও তত কম; আর সঞ্চয় কম হলে বিনিয়োগ ও মূলধন গঠনও কমে যায়।
২. সঞ্চয়ের অভাব (Lack of Savings): আয়ের নিম্নস্তর, উচ্চ ভোগের প্রবণতা এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধির কারণে জাতীয় সঞ্চয়ের হার খুবই কম। দেশে সঞ্চয় হার GDP-র তুলনায় এখনও সন্তোষজনক নয়। সঞ্চয়ের ঘাটতি বিনিয়োগে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
৩. বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা (Limited Investment Opportunities): লাভজনক ও নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র স্বল্প হওয়ায় অনেকেই বিনিয়োগে অনাগ্রহী। প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি, কর-ঝুঁকি ও অনিশ্চিত বাজারব্যবস্থা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। ফলে মূলধন গঠনের গতি মন্থর থাকে।
৪. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা (Political Instability): রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতা বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট করে। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে আস্থা হারান। ফলে দেশীয় ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৫. দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা (Corruption and Bureaucratic Complexity): বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি বড় সমস্যা। প্রকল্প অনুমোদন, ঋণ বিতরণ ও সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও ঘুষের প্রবণতা মূলধন গঠনে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া প্রশাসনিক জটিলতা বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দেয়।
৬. প্রযুক্তিগত পশ্চাদপদতা (Technological Backwardness): বাংলাদেশে শিল্প ও উৎপাদন খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। পুরনো যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাবের কারণে উৎপাদনশীলতা কমে যায়, ফলে বিনিয়োগের ওপর আস্থা হ্রাস পায়।
৭. বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি (Shortage of Foreign Exchange): বিনিয়োগ ও শিল্পোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও প্রযুক্তি আমদানির ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। কিন্তু রপ্তানি আয় সীমিত হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট দেখা দেয়, যা মূলধন গঠনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
৮. অবকাঠামোগত দুর্বলতা (Weak Infrastructure): অপর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, গ্যাস, যোগাযোগব্যবস্থা, বন্দর সুবিধা ও পরিবহন সমস্যার কারণে শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিনিয়োগ ব্যাহত হয়। অবকাঠামো উন্নয়ন না হলে মূলধন গঠন কার্যকরভাবে সম্ভব হয় না।
৯. বৈদেশিক বিনিয়োগের স্বল্পতা (Lack of Foreign Investment): বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনি সুরক্ষার অভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখান না। ফলে দেশের মূলধন সঞ্চয় বহুলাংশে দেশীয় উৎসের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
১০. দক্ষ জনবল ও উদ্যোক্তার অভাব (Lack of Skilled Manpower and Entrepreneurship): শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ঘাটতির কারণে দক্ষ শ্রমশক্তি ও দক্ষ উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না। অদক্ষ কর্মী উৎপাদনশীলতা কমায়, যা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে।
১১. উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধি (High Population Growth): দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি সঞ্চয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আয় বাড়লেও পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় ভোগ ব্যয় বেড়ে যায়, ফলে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ কমে যায়।
১২. সামাজিক রীতিনীতি ও ব্যয়প্রবণতা (Social Customs and Spending Habits): বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করার প্রবণতা ব্যক্তিগত সঞ্চয়কে হ্রাস করে। এই ব্যয়বহুল সংস্কৃতি মূলধন গঠনে বাধা সৃষ্টি করে।
১৩. পুঁজি পাচার (Capital Flight): দেশের অনেক ধনী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তাহীনতা ও করজটিলতার কারণে বিদেশে অর্থ স্থানান্তর করেন। এর ফলে দেশীয় অর্থনীতি থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি বেরিয়ে যায়, যা মূলধন গঠনের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর।
১৪. আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা (Weak Financial Institutions): ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে সঞ্চিত অর্থ উৎপাদনমুখী খাতে সঠিকভাবে প্রবাহিত হয় না। এর ফলে মূলধন সঞ্চয়ের কার্যকারিতা হ্রাস পায়।
উপরের আলোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে মূলধন গঠনের পথে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এসব সমস্যা দূরীকরণ অপরিহার্য। সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমেই বাংলাদেশের মূলধন গঠনের গতি ত্বরান্বিত করা সম্ভব।
Post a Comment