মূলধন গঠনে প্রভাব বিস্তারকারী উপাদানসমূহ (Factors Affecting Capital Formation)

মূলধন গঠনে প্রভাব বিস্তারকারী উপাদানসমূহ

(Factors Affecting Capital Formation)

মূলধন গঠন অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। একটি দেশের উৎপাদনশীল সম্পদ যত বেশি বৃদ্ধি পায়, সেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তত দ্রুত ঘটে। মূলধন গঠন বলতে বোঝায়—অর্থনীতিতে নতুন যন্ত্রপাতি, কারখানা, ভবন, যানবাহন, অবকাঠামো ইত্যাদি উৎপাদন উপকরণে বিনিয়োগের মাধ্যমে পুঁজির সঞ্চয় ও বৃদ্ধি।

মূলধন গঠনের ওপর বিভিন্ন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উপাদান প্রভাব বিস্তার করে। নিচে এসব উপাদান সংক্ষেপে আলোচনা করা হলোঃ 

১. সঞ্চয়ের হার (Rate of Saving): সঞ্চয় মূলধন গঠনের মূল ভিত্তি। জাতীয় আয়ের যে অংশ ভোগে ব্যয় না করে সঞ্চয় করা হয়, সেটিই বিনিয়োগে রূপ নেয় এবং মূলধন সৃষ্টি করে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও জাতীয় পর্যায়ে সঞ্চয়ের হার যত বেশি হবে, মূলধন গঠনের গতি তত দ্রুত হবে।

২. বিনিয়োগের সুযোগ (Opportunities for Investment): লাভজনক ও নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, পরিবহন, যোগাযোগ ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ মূলধন গঠনে সহায়তা করে।

৩. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা (Economic Stability): মূল্যস্ফীতি, মূল্যপতন, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বাজারের অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করে। স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং মূলধন গঠনের জন্য অনুকূল ভূমিকা পালন করে।

৪. সুদের হার (Rate of Interest): উচ্চ সুদের হার মানুষকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করলেও বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, অতিমাত্রায় নিম্ন সুদের হার বিনিয়োগ বাড়ালেও সঞ্চয় কমিয়ে দেয়। তাই ভারসাম্যপূর্ণ সুদের হার মূলধন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয়।

৫. সরকারের নীতি (Government Policy): সরকারের করনীতি, রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি, বাণিজ্যনীতি ও শিল্পনীতি মূলধন গঠনের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। বিনিয়োগবান্ধব নীতি যেমন—কর রেয়াত, সুদমুক্ত ঋণ, ভর্তুকি, বিনিয়োগ সুরক্ষা ইত্যাদি মূলধন গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

৬. প্রযুক্তিগত উন্নতি (Technological Progress): উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার উৎপাদন বৃদ্ধি করে এবং নতুন শিল্প ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মূলধনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।

৭. মানবসম্পদ বা দক্ষ শ্রমশক্তি (Human Resource or Skilled Labour): দক্ষ, শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত জনবল উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে মূলধন গঠনে ভূমিকা রাখে।

৮. প্রাকৃতিক সম্পদ (Natural Resources): প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন—খনিজ, ভূমি, পানি, বন ইত্যাদি শিল্প স্থাপন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। পর্যাপ্ত সম্পদের অভাব মূলধন গঠনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

৯. অর্থনৈতিক অবকাঠামো (Economic Infrastructure): পর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, বন্দর, ব্যাংক, পরিবহন ও তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি অবকাঠামো উন্নয়ন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করে এবং মূলধন গঠনের হার বৃদ্ধি করে।

১০. সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ (Socio-political Environment): স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও বিনিয়োগবান্ধব সমাজব্যবস্থা মূলধন গঠনের জন্য অপরিহার্য।

১১. বৈদেশিক সাহায্য ও বিনিয়োগ (Foreign Aid and Investment): উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিদেশি সাহায্য, অনুদান, ঋণ ও প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ মূলধন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। 

১২. উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা (Entrepreneurship and Management Skill): দক্ষ উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিত করেন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদন ও লাভ বৃদ্ধি করেন। এর ফলে মূলধন সঞ্চয় বৃদ্ধি পায়।উপসংহার :

উপরের আলোচনায় দেখা যায় যে, মূলধন গঠনের ওপর নানাবিধ উপাদান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে। সঞ্চয়, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ একত্রে একটি দেশের মূলধন গঠনের ভিত্তি গড়ে তোলে। উন্নত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এসব উপাদান সঠিকভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

Post a Comment

Previous Post Next Post